’৭১-এর বিপ্লবী মুক্তিযুদ্ধ- ৫০-বর্ষপূর্তি পালন করুন ভারত-আওয়ামী ভুয়া ‘মুক্তিযুদ্ধ-চেতনা’র উন্মোচন করুন!
আন্দোলন প্রতিবেদন
রবিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | অনলাইন সংস্করণ
৫০ বছর আগে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির পত্তন হয়েছিল। জনগণের দিক থেকে, তাদের প্রতিনিধিত্ব করে এরকম বহু বিভিন্ন ঘরানার রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্বে, জনগণের একটি বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল সে বছরের ৯ মাস ধরে। একইসাথে জনগণের মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বিভিন্ন বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল (সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী) শক্তি ও তাদের দেশীয় দালালদের চক্রান্ত চ‚ড়ান্ত মাত্রায় কার্যকর ছিল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমরা আজ রাষ্ট্র ও জাতীয় বিশ্বাসঘাতক বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির পক্ষ থেকে যে বয়ান শুনি সেটা মূলত উপরের দ্বিতীয় অংশের ভাষ্য। সেই ভুয়া-চেতনাকেই আজ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নামে এবং ইতিহাস বলে চালানো হচ্ছে। তাই, আজ যখন সেই রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের ৫০-বর্ষপূর্তি চলছে তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো তার প্রকৃত চেতনাকে তুলে ধরা এবং মুক্তিযুদ্ধ বা ’৭১-কে নিয়ে ভুয়া প্রতিক্রিয়াশীল চেতনার উন্মেচন করা। নিশ্চয়ই এ নিবন্ধটিতে এই সমগ্র ইতিহাস ও তথ্যাবলির কোনো ক্ষুদ্র অংশকেও তুলে ধরা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় তার মোটামুটি একটি সার্বিক মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণও। এখানে শুধু মুক্তিযুদ্ধকালের মূল দুটো ধারাকে তুলে ধরার কাজটিই করা যাবে।
- ’৭১-সাল নিয়ে শাসকশ্রেণির, বিশেষত আওয়ামী লীগ, তার সরকার ও দালাল বুদ্ধিজীবীদের বিপুল ভাষণ ও ব্যাখ্যাকে স্রেফ মিথ্যা বললেও কম বলা হবে। সেটা ছিল ও রয়েছে গণশত্রু সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব-ব্যবস্থা দ্বারা চাপানো এক ঘোরতর ষড়যন্ত্র। শাসকশ্রেণি বিশেষত আওয়ামী লীগ দ্বারা তাদের বিশ্বাসঘাতকতাকে লুকানোর মাধ্যমে দেশ ও জনগণকে তাদের মিথ্যা ইতিহাস গেলানোরই এক গভীর চক্রান্ত। ’৭১-সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর গণহত্যার একেবারে সূচনালগ্ন থেকেই মুক্তিযুদ্ধ পরস্পর বিপরীত মৌলিক দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যারা আজ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দাবি করে সেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের শীর্ষ অংশ কখনোই এই দেশের মাটিতে থেকে এই দেশের জনগণের উপর নির্ভর করে মুক্তিযুদ্ধ করেনি। তাদের নেতৃত্বদের একাংশ হয় পাকিস্তানের কাছে আত্মসমর্পণ করে, নতুবা ভারতে পালিয়ে যায় জনগণকে পাকিস্তানি গোলার মুখে ফেলে রেখে। আওয়ামী নেতৃত্ব ভারতে গিয়ে ভারতেরই পরামর্শে একটি সরকার গঠন করে, যার নেতৃত্বে তারা মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করেছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু ভারত কখনই কোনো নিপীড়িত জাতির মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু ছিলনা ও নেই। ভারত পাকিস্তানি বাহিনীর মতই নিজ দেশে জাতিগত মুক্তি-আন্দোলনকে দমন-নির্যাতন করেছে, এখনো করছে- কাশ্মীর ও উত্তর-পূর্ব ভারত যার দৃষ্টান্ত।
কিন্তু ’৭১-এ এই ভারতই হয়ে গেল ‘মুক্তিযুদ্ধের’ বন্ধু। কার কল্যাণে? আওয়ামী জাতীয় বিশ্বাসঘাতক রাজনীতির কল্যাণে। বর্তমান সরকার যখন তাদের মুক্তিযুদ্ধ সংস্করণের ৫০-তম বার্ষিকী পালন করছে তখন দেশে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে বিশ্বের নিকৃষ্টতম এক ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট ভারতের মোদিকে। ’৭১-সালে ভারতে বসে ‘বাংলাদেশ সরকার’ গঠনের রাজনৈতিক ও নৈতিক কোনো অধিকার কি আওয়ামী লীগের ছিল? ছিল না। কারণ, পাকিস্তান আমলের শেষ যে নির্বাচন, ১৯৭০-এর নির্বাচন, তাতে বহু বামপন্থী ও পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাকামী শক্তি অংশ নেননি। কিন্তু আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় এবং অখণ্ড পাকিস্তানের সরকার গঠন ও সংবিধান রচনার বুর্জোয়া অধিকার প্রাপ্ত হয়। তাদেরকে সেই নির্বাচনে পাকিস্তান থেকে পৃথক একটি দেশের সরকার গঠনের অধিকার দেয়া হয়নি, তারাও সেটা চায়নি।
কিন্তু ২৫ মার্চের পর সমগ্র রাজনৈতিক পরিস্থিতিই বদলে যায়, গণহত্যা শুরু হয়। পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতার জন্য পূর্ব বাংলার জনগণও যুদ্ধে নামেন। সে অবস্থায় যারা আওয়ামী লীগ থেকে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের অনেকেই পাকিস্তানের কাছে আত্মসমর্পণ করে- কিছু আগে বা পরে। অনেকে ভারতে গিয়েও পাকিস্তানের পক্ষে ষড়যন্ত্র চালায়। তাহলে কীভাবে সেই সাংসদগণ নতুন একটি রাষ্ট্রের সরকার গঠন করতে পারেন? তখন একমাত্র সমাধান ছিল যারা দেশের জনগণের উপর নির্ভর করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করছে তাদের সবার সমন্বয়ে একটি ‘জাতীয় সরকার’ বা ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠন করা। সেটা আওয়ামী লীগ করেনি। তারা কীভাবে সরকার গঠন করেছে সেটাও প্রকাশিত নয়। ১০ এপ্রিল তারিখে ভারতের আগরতলায় সরকার গঠনে আওয়ামী লীগের কতজন এমপি অংশ নেন? কে তা জানে? যে কারণে ভারতে অবস্থান সত্ত্বেও বিভিন্ন গ্রুপ আওয়ামী লীগের ভেতরে ও বাইরে- এ প্রবাসী সরকারের বিরুদ্ধে গ্রুপিং করেছে।
এমন একটি সরকারই নাকি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। আসলে এটা ছিল সম্পূর্ণভাবেই ভারতের একটি পরিকল্পনা, যার সাথে এমনকি শেখ মুজিবেরও প্রকাশিত কোনো সম্পর্ক ছিল না। অথচ মুজিবকেই, তার মতামত না নিয়েই, এমন একটি সরকারের প্রেসিডেন্ট বানানো হয়, এবং এখন বলা হচ্ছে যে তিনিই নাকি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এটা তো ২৫ মার্চ-পূর্ব রাজনীতি, আর ২৫ মার্চ-পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধ- দুটোকে একাকার করে ফেলা ছাড়া আর কিছু নয়। এটা তো মুক্তিযুদ্ধকে বোঝারই ব্যর্থতা। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কীভাবে প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধকে নেতৃত্ব দেবে? * তারপরের ইতিহাস সচেতন মানুষ জানেন। কয়েকমাস পরেই পাকিস্তানের সাথে ভারতের যুদ্ধ বেধে যায় এবং ভারতের কাছে পাকিস্তান পরাজিত হয়, যাতে সহায়তা করেছিল আওয়ামী নেতৃত্ব ও ভারত-মদদপুষ্ট আওয়ামী মুক্তিবাহিনী। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। এই নতুন রাষ্ট্র যে জনগণের নয়, গণবিরোধী ও জাতীয় বিশ্বাসঘাতক নব্য মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির সেটা আজ আর কোনো অস্পষ্ট বিষয় নয়। ‘মুক্তিযুদ্ধ চেতনা’র-তো বটেই এমনকি ’৭১- এর পাক-দালাল জামাতের নেতারাও রয়েছে। সুতরাং তারা ’৭১-এ যা প্রতিষ্ঠা করলো সেটা কি প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ চেতনার রাষ্ট্র? পাকিস্তানের বদলে ভারতের ও সাম্রাজ্যবাদের বর্ধিত শোষণ ও আধিপত্যের অধীনে যাওয়া, পাকিস্তান আমলের চেয়ে আরো দশ-বিশগুণ ধন-বৈষম্যের সৃষ্টি হওয়া, ধর্মকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির সাথে দিনে দিনে শক্ত করে জড়িয়ে ফেলা, এবং একটি নির্বাচন-বিহীন উগ্রজাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদ কায়েম করা- এগুলো কি মুক্তিযুদ্ধ চেতনা? এগুলো হলো জাতীয় বিশ্বাসঘাতক চেতনা ও ফ্যাসিবাদী চেতনা যার অঙ্কুরোদগম হয়েছিল ’৭১-সালের সেই মহাদুর্যোগ ও জনতার গৌরবময় ত্যাগ-বীরত্ব-সংগ্রামের কালেই- ভারতের মাটিতে, ভারতের মদদে, ভারতের পরিকল্পনায় আওয়ামী লীগের গর্ভে।
* প্রশ্ন হলো, জনগণ বা তার স্বার্থরক্ষাকারী শক্তি কি ছিল না? তারা কি মুক্তিযুদ্ধ করেননি? অবশ্যই করেছেন, এবং সবচেয়ে বেশি ত্যাগ, বীরত্ব ও আত্মবলিদান দিয়েই করেছেন। সেই ইতিহাসকে পরিকল্পিত ভাবে মাটিচাপা দিয়েছে এই শাসকশ্রেণি।
- খুব সংক্ষেপে যা বলা যায় তাহলো,
’৭১-সালে যেসব শক্তি দেশের মাটিতে থেকে দেশের জনগণের উপর নির্ভর করে মুক্তিযুদ্ধ করেছে তার পুরোভাগে ছিলেন মাওবাদী শক্তিগুলো। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েছেন। বরিশাল (বিশেষত পেয়ারাবাগান এলাকা), মাদারীপুর, নড়াইল, যশোর, খুলনা, রাজশাহী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ঢাকা- প্রভৃতি জেলায় তাদের নেতৃত্বে বিপ্লবী গণযুদ্ধ গড়ে উঠেছিল- যার বিবরণ এখানে দেয়া সম্ভব নয়। অবশ্য এই গণযুদ্ধ পরাজিত হয়ে যায় একদিকে পাকবাহিনী ও অন্যদিকে ভারত থেকে আসা আওয়ামী বাহিনীর আক্রমণের মুখে। মাওবাদী ছাড়াও আরো কিছু বামপন্থি নেতৃত্বেও দেশের কিছু জায়গায় মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। এমনকি কাদের সিদ্দিকীর মত কিছু জাতীয়তাবাদীও জনগণের উপর নির্ভর করে কিছুটা সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েছিল, যারা অবশ্য পরে ভারত ও আওয়ামী প্রবাসী সরকারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এর আগে এপ্রিল পর্যন্ত যে প্রতিরোধ যুদ্ধ চলেছিল সেখানেও ভারতের সাহায্য ছাড়াই এবং আওয়ামী শীর্ষ নেতৃত্বদের পলায়ন ও নেতিবাচক ভ‚মিকা সত্ত্বেও স্থানীয় পর্যায়ে বহু মাঝারি সারির আওয়ামী নেতা, সাধারণ কর্মী, বামপন্থী, মাওবাদীসহ অসংখ্য সাধারণ জনগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এগুলোই ছিল প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ, যার কেন্দ্রে ছিল বিপ্লবী মুক্তিযুদ্ধের দিশা। * সুতরাং ভারত-আওয়ামী ’৭১-চেতনাকে যেমন বিরোধিতা ও উন্মোচন করতে হবে, তেমনি প্রকৃত বা বিপ্লবী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেও বিরাটভাবে জনগণের মাঝে পুনর্জীবিত করতে হবে। এবং তারই ভিত্তিতে এক নতুন মুক্তিযুদ্ধের পথে হাঁটতে হবে, যাতে সাম্রাজ্যবাদ-ভারতের দালাল মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির জাতীয় বিশ্বাসঘাতক চরিত্রকে উন্মোচন করা হবে এবং কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ মধ্যবিত্তের গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠার কর্মসূচিকে ভিত্তি করা হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
’৭১-এর বিপ্লবী মুক্তিযুদ্ধ- ৫০-বর্ষপূর্তি পালন করুন ভারত-আওয়ামী ভুয়া ‘মুক্তিযুদ্ধ-চেতনা’র উন্মোচন করুন!
৫০ বছর আগে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির পত্তন হয়েছিল। জনগণের দিক থেকে, তাদের প্রতিনিধিত্ব করে এরকম বহু বিভিন্ন ঘরানার রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্বে, জনগণের একটি বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল সে বছরের ৯ মাস ধরে। একইসাথে জনগণের মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে বিভিন্ন বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল (সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী) শক্তি ও তাদের দেশীয় দালালদের চক্রান্ত চ‚ড়ান্ত মাত্রায় কার্যকর ছিল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমরা আজ রাষ্ট্র ও জাতীয় বিশ্বাসঘাতক বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির পক্ষ থেকে যে বয়ান শুনি সেটা মূলত উপরের দ্বিতীয় অংশের ভাষ্য। সেই ভুয়া-চেতনাকেই আজ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নামে এবং ইতিহাস বলে চালানো হচ্ছে। তাই, আজ যখন সেই রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধের ৫০-বর্ষপূর্তি চলছে তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো তার প্রকৃত চেতনাকে তুলে ধরা এবং মুক্তিযুদ্ধ বা ’৭১-কে নিয়ে ভুয়া প্রতিক্রিয়াশীল চেতনার উন্মেচন করা। নিশ্চয়ই এ নিবন্ধটিতে এই সমগ্র ইতিহাস ও তথ্যাবলির কোনো ক্ষুদ্র অংশকেও তুলে ধরা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় তার মোটামুটি একটি সার্বিক মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণও। এখানে শুধু মুক্তিযুদ্ধকালের মূল দুটো ধারাকে তুলে ধরার কাজটিই করা যাবে।
- ’৭১-সাল নিয়ে শাসকশ্রেণির, বিশেষত আওয়ামী লীগ, তার সরকার ও দালাল বুদ্ধিজীবীদের বিপুল ভাষণ ও ব্যাখ্যাকে স্রেফ মিথ্যা বললেও কম বলা হবে। সেটা ছিল ও রয়েছে গণশত্রু সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব-ব্যবস্থা দ্বারা চাপানো এক ঘোরতর ষড়যন্ত্র। শাসকশ্রেণি বিশেষত আওয়ামী লীগ দ্বারা তাদের বিশ্বাসঘাতকতাকে লুকানোর মাধ্যমে দেশ ও জনগণকে তাদের মিথ্যা ইতিহাস গেলানোরই এক গভীর চক্রান্ত। ’৭১-সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর গণহত্যার একেবারে সূচনালগ্ন থেকেই মুক্তিযুদ্ধ পরস্পর বিপরীত মৌলিক দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। যারা আজ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দাবি করে সেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের শীর্ষ অংশ কখনোই এই দেশের মাটিতে থেকে এই দেশের জনগণের উপর নির্ভর করে মুক্তিযুদ্ধ করেনি। তাদের নেতৃত্বদের একাংশ হয় পাকিস্তানের কাছে আত্মসমর্পণ করে, নতুবা ভারতে পালিয়ে যায় জনগণকে পাকিস্তানি গোলার মুখে ফেলে রেখে। আওয়ামী নেতৃত্ব ভারতে গিয়ে ভারতেরই পরামর্শে একটি সরকার গঠন করে, যার নেতৃত্বে তারা মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত করেছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু ভারত কখনই কোনো নিপীড়িত জাতির মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু ছিলনা ও নেই। ভারত পাকিস্তানি বাহিনীর মতই নিজ দেশে জাতিগত মুক্তি-আন্দোলনকে দমন-নির্যাতন করেছে, এখনো করছে- কাশ্মীর ও উত্তর-পূর্ব ভারত যার দৃষ্টান্ত।
কিন্তু ’৭১-এ এই ভারতই হয়ে গেল ‘মুক্তিযুদ্ধের’ বন্ধু। কার কল্যাণে? আওয়ামী জাতীয় বিশ্বাসঘাতক রাজনীতির কল্যাণে। বর্তমান সরকার যখন তাদের মুক্তিযুদ্ধ সংস্করণের ৫০-তম বার্ষিকী পালন করছে তখন দেশে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে বিশ্বের নিকৃষ্টতম এক ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট ভারতের মোদিকে। ’৭১-সালে ভারতে বসে ‘বাংলাদেশ সরকার’ গঠনের রাজনৈতিক ও নৈতিক কোনো অধিকার কি আওয়ামী লীগের ছিল? ছিল না। কারণ, পাকিস্তান আমলের শেষ যে নির্বাচন, ১৯৭০-এর নির্বাচন, তাতে বহু বামপন্থী ও পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাকামী শক্তি অংশ নেননি। কিন্তু আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয় এবং অখণ্ড পাকিস্তানের সরকার গঠন ও সংবিধান রচনার বুর্জোয়া অধিকার প্রাপ্ত হয়। তাদেরকে সেই নির্বাচনে পাকিস্তান থেকে পৃথক একটি দেশের সরকার গঠনের অধিকার দেয়া হয়নি, তারাও সেটা চায়নি।
কিন্তু ২৫ মার্চের পর সমগ্র রাজনৈতিক পরিস্থিতিই বদলে যায়, গণহত্যা শুরু হয়। পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতার জন্য পূর্ব বাংলার জনগণও যুদ্ধে নামেন। সে অবস্থায় যারা আওয়ামী লীগ থেকে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের অনেকেই পাকিস্তানের কাছে আত্মসমর্পণ করে- কিছু আগে বা পরে। অনেকে ভারতে গিয়েও পাকিস্তানের পক্ষে ষড়যন্ত্র চালায়। তাহলে কীভাবে সেই সাংসদগণ নতুন একটি রাষ্ট্রের সরকার গঠন করতে পারেন? তখন একমাত্র সমাধান ছিল যারা দেশের জনগণের উপর নির্ভর করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করছে তাদের সবার সমন্বয়ে একটি ‘জাতীয় সরকার’ বা ‘বিপ্লবী সরকার’ গঠন করা। সেটা আওয়ামী লীগ করেনি। তারা কীভাবে সরকার গঠন করেছে সেটাও প্রকাশিত নয়। ১০ এপ্রিল তারিখে ভারতের আগরতলায় সরকার গঠনে আওয়ামী লীগের কতজন এমপি অংশ নেন? কে তা জানে? যে কারণে ভারতে অবস্থান সত্ত্বেও বিভিন্ন গ্রুপ আওয়ামী লীগের ভেতরে ও বাইরে- এ প্রবাসী সরকারের বিরুদ্ধে গ্রুপিং করেছে।
এমন একটি সরকারই নাকি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। আসলে এটা ছিল সম্পূর্ণভাবেই ভারতের একটি পরিকল্পনা, যার সাথে এমনকি শেখ মুজিবেরও প্রকাশিত কোনো সম্পর্ক ছিল না। অথচ মুজিবকেই, তার মতামত না নিয়েই, এমন একটি সরকারের প্রেসিডেন্ট বানানো হয়, এবং এখন বলা হচ্ছে যে তিনিই নাকি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এটা তো ২৫ মার্চ-পূর্ব রাজনীতি, আর ২৫ মার্চ-পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধ- দুটোকে একাকার করে ফেলা ছাড়া আর কিছু নয়। এটা তো মুক্তিযুদ্ধকে বোঝারই ব্যর্থতা। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ কীভাবে প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধকে নেতৃত্ব দেবে? * তারপরের ইতিহাস সচেতন মানুষ জানেন। কয়েকমাস পরেই পাকিস্তানের সাথে ভারতের যুদ্ধ বেধে যায় এবং ভারতের কাছে পাকিস্তান পরাজিত হয়, যাতে সহায়তা করেছিল আওয়ামী নেতৃত্ব ও ভারত-মদদপুষ্ট আওয়ামী মুক্তিবাহিনী। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়। এই নতুন রাষ্ট্র যে জনগণের নয়, গণবিরোধী ও জাতীয় বিশ্বাসঘাতক নব্য মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির সেটা আজ আর কোনো অস্পষ্ট বিষয় নয়। ‘মুক্তিযুদ্ধ চেতনা’র-তো বটেই এমনকি ’৭১- এর পাক-দালাল জামাতের নেতারাও রয়েছে। সুতরাং তারা ’৭১-এ যা প্রতিষ্ঠা করলো সেটা কি প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ চেতনার রাষ্ট্র? পাকিস্তানের বদলে ভারতের ও সাম্রাজ্যবাদের বর্ধিত শোষণ ও আধিপত্যের অধীনে যাওয়া, পাকিস্তান আমলের চেয়ে আরো দশ-বিশগুণ ধন-বৈষম্যের সৃষ্টি হওয়া, ধর্মকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির সাথে দিনে দিনে শক্ত করে জড়িয়ে ফেলা, এবং একটি নির্বাচন-বিহীন উগ্রজাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদ কায়েম করা- এগুলো কি মুক্তিযুদ্ধ চেতনা? এগুলো হলো জাতীয় বিশ্বাসঘাতক চেতনা ও ফ্যাসিবাদী চেতনা যার অঙ্কুরোদগম হয়েছিল ’৭১-সালের সেই মহাদুর্যোগ ও জনতার গৌরবময় ত্যাগ-বীরত্ব-সংগ্রামের কালেই- ভারতের মাটিতে, ভারতের মদদে, ভারতের পরিকল্পনায় আওয়ামী লীগের গর্ভে।
* প্রশ্ন হলো, জনগণ বা তার স্বার্থরক্ষাকারী শক্তি কি ছিল না? তারা কি মুক্তিযুদ্ধ করেননি? অবশ্যই করেছেন, এবং সবচেয়ে বেশি ত্যাগ, বীরত্ব ও আত্মবলিদান দিয়েই করেছেন। সেই ইতিহাসকে পরিকল্পিত ভাবে মাটিচাপা দিয়েছে এই শাসকশ্রেণি।
- খুব সংক্ষেপে যা বলা যায় তাহলো,
’৭১-সালে যেসব শক্তি দেশের মাটিতে থেকে দেশের জনগণের উপর নির্ভর করে মুক্তিযুদ্ধ করেছে তার পুরোভাগে ছিলেন মাওবাদী শক্তিগুলো। তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বীরত্বপূর্ণ মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েছেন। বরিশাল (বিশেষত পেয়ারাবাগান এলাকা), মাদারীপুর, নড়াইল, যশোর, খুলনা, রাজশাহী, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ঢাকা- প্রভৃতি জেলায় তাদের নেতৃত্বে বিপ্লবী গণযুদ্ধ গড়ে উঠেছিল- যার বিবরণ এখানে দেয়া সম্ভব নয়। অবশ্য এই গণযুদ্ধ পরাজিত হয়ে যায় একদিকে পাকবাহিনী ও অন্যদিকে ভারত থেকে আসা আওয়ামী বাহিনীর আক্রমণের মুখে। মাওবাদী ছাড়াও আরো কিছু বামপন্থি নেতৃত্বেও দেশের কিছু জায়গায় মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। এমনকি কাদের সিদ্দিকীর মত কিছু জাতীয়তাবাদীও জনগণের উপর নির্ভর করে কিছুটা সময় ধরে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েছিল, যারা অবশ্য পরে ভারত ও আওয়ামী প্রবাসী সরকারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এর আগে এপ্রিল পর্যন্ত যে প্রতিরোধ যুদ্ধ চলেছিল সেখানেও ভারতের সাহায্য ছাড়াই এবং আওয়ামী শীর্ষ নেতৃত্বদের পলায়ন ও নেতিবাচক ভ‚মিকা সত্ত্বেও স্থানীয় পর্যায়ে বহু মাঝারি সারির আওয়ামী নেতা, সাধারণ কর্মী, বামপন্থী, মাওবাদীসহ অসংখ্য সাধারণ জনগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এগুলোই ছিল প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ, যার কেন্দ্রে ছিল বিপ্লবী মুক্তিযুদ্ধের দিশা। * সুতরাং ভারত-আওয়ামী ’৭১-চেতনাকে যেমন বিরোধিতা ও উন্মোচন করতে হবে, তেমনি প্রকৃত বা বিপ্লবী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেও বিরাটভাবে জনগণের মাঝে পুনর্জীবিত করতে হবে। এবং তারই ভিত্তিতে এক নতুন মুক্তিযুদ্ধের পথে হাঁটতে হবে, যাতে সাম্রাজ্যবাদ-ভারতের দালাল মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া শাসকশ্রেণির জাতীয় বিশ্বাসঘাতক চরিত্রকে উন্মোচন করা হবে এবং কৃষক-শ্রমিক-সাধারণ মধ্যবিত্তের গণক্ষমতা প্রতিষ্ঠার কর্মসূচিকে ভিত্তি করা হবে।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র